ওমরাহ পালনের ধারাবাহিক নিয়ম ও দোয়া | ওমরাহ পালনের সঠিক পদ্ধতি
ওমরাহ এমন একটি মহান ইবাদত, যা একজন মুসলমানের জীবনে আত্মিক পরিবর্তন, গুনাহ মাফের আশা এবং আল্লাহর
নৈকট্য লাভের এক
বিশেষ সুযোগ এনে দেয়। অনেকেই হজের তুলনায় ওমরাহকে সহজ মনে করেন, কারণ এটি বছরের নির্দিষ্ট সময়ের
মধ্যে সীমাবদ্ধ
নয়। তবে সহজ হলেও এর নিজস্ব নিয়ম, ধাপ, আদব ও প্রস্তুতি রয়েছে।
বিশেষ করে যারা প্রথমবার যাচ্ছেন, তাদের মনে সাধারণত কিছু প্রশ্ন থাকে: কিভাবে উমরাহ পালন করবেন?
ইহরাম কোথায় বাঁধতে
হয়? তাওয়াফ কীভাবে করতে হয়? সাঈ করার নিয়ম কী? কোন সময় কোন দোয়া পড়তে হয়?
এই গাইডে আমরা ধাপে ধাপে আলোচনা করবো ওমরাহ পালনের ধারাবাহিক নিয়ম ও দোয়া, ওমরাহ পালনের সঠিক
পদ্ধতি, পুরুষ ও
নারীদের আলাদা নির্দেশনা, সাধারণ ভুল, এবং দরকারি টিপস।
ওমরাহ কী? ওমরাহর ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতসমূহ
ওমরাহ হলো মক্কা মুকাররমায় কাবা শরীফকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কিছু ইবাদত সম্পন্ন করার নাম। হজের
মতো এটি নির্দিষ্ট
সময়ে নয়; বরং বছরের যে কোনো সময়ে পালিত হয়। ওমরাহ বছরের অধিকাংশ সময় করা যায়। এটি হজ নয়, তবে
অত্যন্ত
মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। ওমরাহর মূল চারটি অংশ:
ইহরাম গ্রহণ
কাবা শরীফ তাওয়াফ
সাফা-মারওয়া সাঈ
চুল কাটা বা ছোট করা
ওমরাহর ফরজ
ইসলামি পরিভাষায় ফরজ সেই সমস্ত অপরিহার্য কাজ যা ব্যতীত ইবাদত সহীহ হয় না। ওমরাহ পালনের ক্ষেত্রে
ফরজ কাজ মূলত
দুইটি:
ইহরাম: নির্ধারিত মীকাত সীমান্তে পৌঁছার পূর্বেই ওমরাহর নিয়ত করে ইহরামের অবস্থায় প্রবেশ করা।
তাওয়াফ: কাবা শরীফের চারদিকে সাত চক্কর ঘোরা ওমরাহর দ্বিতীয় ফরজ কাজ। তাওয়াফ ছাড়া ওমরাহ
সম্পূর্ণ হয় না।
ওয়াজিব
ওয়াজিব সেই সকল কাজ যা ওমরাহ পালনকালে অবশ্য পালনীয়, তবে ফরজের মতো নয়। কোনো ওয়াজিব কাজ ছুটে
গেলে ওমরাহ বাতিল না
হলেও নির্ধারিত দম (পশু কোরবানি) দিতে হয়। ওমরাহর ওয়াজিব কাজ মূলত দুইটি:
মিকাত পার হওয়ার আগেই ইহরাম বাঁধা: যে ব্যক্তি উমরাহ বা হজ করার নিয়তে মক্কার দিকে
যাচ্ছে, তাকে
নির্ধারিত সীমা—যাকে মিকাত বলা হয়—সেই সীমা পার হওয়ার আগেই ইহরাম গ্রহণ করতে হবে।
সাফা-মারওয়ায় সাঈ করা: কাবা তাওয়াফের পর সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মধ্যে
সাতবার দ্রুত
পদক্ষেপে চলা বা দৌড়ানো ওমরাহর একটি আবশ্যিক অংশ। হাজেরা (আ.) এর স্মৃতিবিজড়িত
এই কাজটি নবী
(সা.) নিজে পালন করেছেন এবং সাহাবীদেরও করতে বলেছেন।
চুল কাটা বা মুন্ডন: ইহরাম অবস্থার নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হতে মাথার চুল ফেলে দিতে হয়। পুরুষরা
সম্পূর্ণ মাথা
মুণ্ডন করা বা চুল ছোট করবেন, আর নারীরা চুলের কিছু অংশ কেটে নেবেন।
সুন্নত
সুন্নত হলো এমন কাজ যা করলে সওয়াব, না করলে গুনাহ নেই, তবে ওমরাহর সৌন্দর্য বাড়ায়। যেসব সুন্নত
কাজ রাসুলুল্লাহ
(সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম নিয়মিত পালন করেছেন:
ইহরামের পূর্ব প্রস্তুতি
তালবিয়া পাঠ করা
জমজম পানি পান
ওমরাহ পালনের ধারাবাহিক নিয়ম ও দোয়া
ওমরাহ পালনের পদ্ধতিটি সহজভাবে এবং সুন্নাহর আলোকে নিচে ধাপে ধাপে বর্ণনা করা হলো।
ধাপ ১: ইহরাম গ্রহণ
ওমরাহ শুরু হয় ইহরাম দিয়ে। মীকাত অতিক্রম করার আগে ইহরাম নিতে হবে। ইহরামের আগে করণীয়:
অনুবাদ: "হে আল্লাহ, এই ঘরের সম্মান ও গৌরভ বৃদ্ধি করুন।"
ধাপ ৩: তাওয়াফ করার নিয়ম
তাওয়াফ হলো কাবা শরীফকে কেন্দ্র করে সাত চক্কর দেওয়া। হাজরে আসওয়াদ দিক থেকে শুরু করুন। কাবা শরীফ
বাম পাশে রাখুন
এবং সাত চক্কর পূর্ণ করুন। শুরুতে বলুন:
بِسْمِ اللهِ، اللهُ أَكْبَرُ
অর্থ: আল্লাহর নামে, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।
নির্দিষ্ট দোয়া বাধ্যতামূলক নয়। আপনি পড়তে পারেন:
অনুবাদ: "হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে উপকারী জ্ঞান, প্রশস্ত রিজিক এবং সকল রোগ থেকে আরোগ্য
কামনা করছি।"
ধাপ ৬: সাফা-মারওয়া সাঈ
কাবা তাওয়াফের পর সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মধ্যে সাতবার দ্রুত পদক্ষেপে চলা বা দৌড়ানো ওমরাহর
একটি আবশ্যিক
অংশ। হাজেরা (আ.) এর স্মৃতিবিজড়িত এই কাজটি নবী (সা.) নিজে পালন করেছেন এবং সাহাবীদেরও করতে
বলেছেন। সাফা থেকে শুরু
করা মারওয়ায় শেষ করার নিয়ম। মোট সাতবার যাতায়াত করা।
ধাপ ৭: চুল কাটা
সাঈ শেষে ওমরাহ সম্পূর্ণ করতে চুল কাটতে হবে। এটি পালন করা সুন্নত ও আনুগত্য প্রকাশের নিদর্শন।
পুরুষদের জন্য মাথা মুন্ডন উত্তম অথবা ছোট করা
নারীদের জন্য অল্প অংশ কেটে নেবেন
ওমরাহর ফজিলত
ওমরাহ শুধু সফর নয়, এটি আত্মার সফর। ওমরাহ মানুষের অন্তরের পাপ ধুয়ে দেয়, জীবনে বরকত আনে এবং
ইমানকে দৃঢ় করে।
অনেক আলেম বলেন, সামর্থ্যবান মুসলমানদের জীবনে অন্তত একবার ওমরাহ করা উচিত, যদিও এটি হজের মতো ফরজ
নয়। ওমরাহর কিছু
ফজিলত:
গুনাহ মাফের আশা
অন্তরের প্রশান্তি
ঈমান শক্তিশালী হয়
আল্লাহর ঘর জিয়ারতের সৌভাগ্য
দোয়া কবুলের উত্তম সময়
জীবন পরিবর্তনের সুযোগ
হাদিসে এসেছে, আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন:
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ سُمَىٍّ، مَوْلَى أَبِي بَكْرِ
بْنِ عَبْدِ
الرَّحْمَنِ عَنْ أَبِي صَالِحٍ السَّمَّانِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ أَنَّ رَسُولَ
اللَّهِ صلى
الله عليه وسلم قَالَ الْعُمْرَةُ إِلَى الْعُمْرَةِ كَفَّارَةٌ لِمَا بَيْنَهُمَا، وَالْحَجُّ
الْمَبْرُورُ
لَيْسَ لَهُ جَزَاءٌ إِلاَّ الْجَنَّةُ
“এক ‘উমরাহ’র পর আর এক ‘উমরাহ উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের (গুনাহের) জন্য কাফফারা। আর জান্নাতই হলো হাজ্জে
মাবরূরের
(বিশুদ্ধ বা গৃহীত) প্রতিদান।” (বুখারী ১৭৭৩, মুসলিম ১৩৪৯)
প্রথমবার গেলে যেসব ভুল করবেন না
প্রথমবার ওমরাহ পালনে গেলে অনেকেই আবেগ, অজ্ঞানতা বা তাড়াহুড়োর কারণে কিছু সাধারণ ভুল করে বসেন।
আগে থেকে এসব বিষয়
জানা থাকলে ইবাদত আরও সুন্দর, শান্তিপূর্ণ এবং সঠিকভাবে সম্পন্ন করা সহজ হয়।
পবিত্র ওমরাহ সফর শুধু একটি ভ্রমণ নয়, এটি ইবাদত, আত্মিক প্রশান্তি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক
বিশেষ সুযোগ। তাই এই
গুরুত্বপূর্ণ সফরে এমন একজন বিশ্বস্ত সঙ্গী প্রয়োজন, যারা পুরো যাত্রায় আপনাকে সঠিক দিকনির্দেশনা,
নির্ভরযোগ্য
সেবা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারে।
সাধারণভাবে ওমরাহ সম্পন্ন করতে ২ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। তবে এটি নির্ভর করে
মসজিদুল হারামে ভিড় কতটা আছে, আপনি কোন সময় তাওয়াফ করছেন এবং সাফা-মারওয়া সাঈ করতে
কত সময় নিচ্ছেন তার ওপর। রমজান, ছুটির মৌসুম বা ব্যস্ত সময়ে সময় বেশি লাগতে পারে।
ওমরাহ কি হজের বিকল্প?
না, ওমরাহ কখনোই হজের বিকল্প নয়। হজ ইসলামের ফরজ ইবাদত, যা সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর
জীবনে একবার ফরজ। অন্যদিকে ওমরাহ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত হলেও এটি হজের পরিবর্তে
যথেষ্ট নয়। তাই যার ওপর হজ ফরজ হয়েছে, তাকে হজ আদায় করতেই হবে।
এক সফরে একাধিক ওমরাহ করা যায়?
হ্যাঁ, অনেক মানুষ এক সফরে একাধিক ওমরাহ আদায় করেন। সাধারণত নতুন ওমরাহ করার জন্য
হারাম এলাকার বাইরে গিয়ে পুনরায় ইহরাম বাঁধতে হয়, যেমন তানইম মসজিদ থেকে। তবে
ইবাদতের মান, মনোযোগ ও শরীরের সক্ষমতা বিবেচনা করাও জরুরি।
নারীরা কি ওমরাহ করতে পারবেন?
অবশ্যই পারবেন। নারীদের জন্যও ওমরাহ একটি ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। তবে শালীন পোশাক, পর্দা,
নিরাপত্তা এবং সফরের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। মাহরাম নিয়ে সফরের বিষয়ে
আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তাই নিজের মাযহাব অনুযায়ী পরামর্শ নেওয়া ভালো।
শিশুদের নিয়ে ওমরাহ করা যাবে?
হ্যাঁ, শিশুদের নিয়ে ওমরাহ করা যায়। অনেক পরিবার সন্তানদের নিয়ে এই পবিত্র সফরে যান।
তবে ভিড়, গরম আবহাওয়া, হাঁটাহাঁটি এবং শিশুর স্বাস্থ্যের বিষয়টি আগে থেকে বিবেচনা
করতে হবে। প্রয়োজনীয় খাবার, পানি, ওষুধ ও বিশ্রামের ব্যবস্থা রাখুন।
ইহরাম কোথায় বাঁধতে হয়?
ইহরাম নির্ধারিত মীকাত অতিক্রম করার আগেই বাঁধতে হয়। বাংলাদেশ থেকে যারা বিমানে যান,
তারা সাধারণত ফ্লাইটে ওঠার আগে বা বিমানে মীকাতের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই ইহরাম নেন।
অনেক এয়ারলাইনস এ বিষয়ে ঘোষণা দিয়ে থাকে।
তাওয়াফে ভুল হলে কী করবেন?
যদি চক্কর গণনায় ভুল হয় বা কোনো অংশ নিয়ে সন্দেহ হয়, তাহলে নিশ্চিত সংখ্যার ওপর
ভিত্তি করে বাকি অংশ সম্পন্ন করুন। বড় ধরনের বিভ্রান্তি হলে স্থানীয় আলেম বা গাইডের
সহায়তা নেওয়া উত্তম। আতঙ্কিত না হয়ে শান্তভাবে সংশোধন করাই ভালো।
চুল না কাটলে কী হবে?
সাঈ শেষ করার পর চুল কাটা বা ছোট করা ওমরাহর সমাপ্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি না করলে
ইহরাম পুরোপুরি শেষ হয় না। তাই পুরুষরা মাথা মুন্ডন বা ছোট করবেন, আর নারীরা চুলের
অল্প অংশ কাটবেন।
সেরা হজ্জ ও উমরাহ
প্যাকেজ বেছে নিন
সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য হজ্জ ও উমরাহ প্যাকেজ জানতে
এখনই ফোন করুন।